কোরআনে মানবভ্রূণের ক্রমবিকাশ ও আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের নিখুঁত সামঞ্জস্য
আধুনিক ভ্রূণবিদ্যা ও চিকিৎসাবিজ্ঞান আলট্রাসাউন্ড এবং অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সহায়তায় মাতৃগর্ভে মানবশিশুর বৃদ্ধির বিভিন্ন ধাপ আবিষ্কার করেছে খুব বেশি দিন হয়নি। অথচ চৌদ্দশত বছর আগেই পবিত্র কোরআনে ভ্রূণ সৃষ্টির প্রতিটি সূক্ষ্ম পর্যায় অত্যন্ত চমৎকার ও বিজ্ঞানসম্মত পরিভাষায় তুলে ধরা হয়েছে।
মানব সৃষ্টির সূচনা সম্পর্কে মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনের সুরা আদ-দাহরের ২ নম্বর আয়াতে উল্লেখ করেছেন, ‘নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি মিশ্রিত বীর্য (নুতফাতুন আমশাজ) থেকে...।’ আরবিতে ‘আমশাজ’ শব্দের অর্থ সংমিশ্রণ। বর্তমান বিজ্ঞানের গবেষণায় প্রমাণিত যে, কেবল পুরুষের শুক্রাণু কিংবা নারীর ডিম্বাণু দিয়ে ভ্রূণ তৈরি হয় না; বরং উভয়ের মিলনেই এই প্রক্রিয়ার সূত্রপাত ঘটে, যাকে কোরআন ‘নুতফাতুন আমশাজ’ বলে অভিহিত করেছে।
গর্ভধারণের কয়েক দিনের মাথায় ভ্রূণটি জরায়ুর দেওয়ালে শক্তভাবে এঁটে থাকে। পবিত্র কোরআনে এ স্তরকে ‘আলাকাহ’ আখ্যা দিয়ে বলা হয়েছে, ‘অতঃপর আমি নুতফাকে আলাকায় পরিণত করেছি...।’ (সুরা মুমিনুন, আয়াত: ১৪)। আরবি ‘আলাকাহ’ শব্দের তিনটি প্রতিশব্দ রয়েছে—জোঁক, ঝুলে থাকা কোনো বস্তু এবং জমাট রক্তপিণ্ড। লক্ষণীয় বিষয় হলো, গর্ভধারণের ১৫ থেকে ২৪ দিনের মাথায় ভ্রূণটি দেখতে হুবহু জোঁকের মতোই রূপ নেয়। এমনকি জোঁক যেমন অন্যের রক্ত শুষে বাঁচে, তেমনি ভ্রূণটিও জরায়ুর গায়ে ঝুলে থেকে মায়ের রক্ত থেকেই প্রয়োজনীয় পুষ্টিরস গ্রহণ করে থাকে।
বিকাশের পরবর্তী স্তরকে কোরআনে ‘মুদগাহ’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে (সুরা মুমিনুন, আয়াত: ১৪), যার আভিধানিক অর্থ ‘দাঁতে চিবানো এক টুকরো মাংস’। অণুবীক্ষণ যন্ত্রে চার সপ্তাহের একটি ভ্রূণ পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, এর পিঠের সোমাইট বা অস্থির আদি খাঁজগুলো দেখতে পুরোপুরি কামড়ের চিহ্নের মতো লাগে; যেন এক খণ্ড চুইংগাম বা গোশত চিবিয়ে রাখা হয়েছে।
চিবানো গোশতপিণ্ডের মতো ধাপ অতিক্রমের পর ভ্রূণে হাড় ও মাংসপেশির উন্মেষ ঘটে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অতঃপর আমি মুদগাহকে হাড়ে (ইজাম) পরিণত করেছি, এরপর সেই হাড়কে গোশত দ্বারা আবৃত করেছি...।’ (সুরা মুমিনুন, আয়াত: ১৪)। ১৯৯৯ সালে রিয়াদের দারু তাইয়িবাহ থেকে প্রকাশিত ‘তাফসিরুল কুরআনিল আজিম’ গ্রন্থের ৫ম খণ্ডের ৪৬৪ পৃষ্ঠায় ইবনে কাসির উল্লেখ করেছেন, এই পর্যায়ে কঙ্কালের কাঠামো গঠিত হয় এবং পরবর্তী সময়ে মাংসপেশি ও রগ দ্বারা তা ঢেকে দেওয়া হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানও একই কথা বলে—প্রথমে তরুণাস্থি বা হাড়ের ফ্রেম তৈরি হয় এবং তার পরেই পেশিকলা বা মাসল টিস্যু সেই হাড়কে আচ্ছাদিত করে।
মাতৃগর্ভে ভ্রূণটি তিনটি অন্ধকারের পর্দায় সুরক্ষিত অবস্থায় বৃদ্ধি পায়। সুরা জুমারের ৬ নম্বর আয়াতে বর্ণিত হয়েছে, ‘তিনি তোমাদের মায়ের গর্ভে পর্যায়ক্রমে সৃষ্টি করেছেন তিনটি অন্ধকারের মধ্যে (জুলুমাতিন সালাস)।’ এই তিনটি পর্দা হলো—মায়ের পেটের বাইরের দেওয়াল, জরায়ুর দেওয়াল এবং ভ্রূণকে ঘিরে থাকা অ্যামনিওটিক থলি।
শারীরিক অবকাঠামো পূর্ণতা পাওয়ার পর তাতে রুহ বা আত্মা সঞ্চারিত হয়। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘এরপর আমি তাকে এক নতুন সৃষ্টিরূপে দাঁড় করিয়েছি’ (সুরা মুমিনুন, আয়াত: ১৪)। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই পর্যায়গুলোর সময়রেখা স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকের সৃষ্টির উপাদান মায়ের গর্ভে ৪০ দিন পর্যন্ত বীর্যরূপে (নুতফাহ) জমা থাকে। এরপর পরবর্তী ৪০ দিন তা জমাট রক্তপিণ্ড (আলাকাহ) হিসেবে থাকে। এরপরের ৪০ দিন তা গোশতপিণ্ড (মুদগাহ) হিসেবে থাকে। এরপর আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন ফেরেশতা পাঠানো হয়, যিনি ওই ভ্রূণের ভেতর রুহ (আত্মা) ফুঁকে দেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩২০৮)। ফলে গর্ভধারণের ঠিক ১২০ দিন পর ভ্রূণটি আত্মিক ও শারীরিকভাবে একজন পূর্ণাঙ্গ মানবের মর্যাদা লাভ করে।





আপনার মতামত লিখুন